প্রিন্টের তারিখ: 15 October 2026 |
প্রকাশের তারিখ: Oct 15, 2026
সংবাদ শিরোনাম : অবাধে চলছে চোরাই গ্যাসের বাণিজ্য: সোনারগাঁয়ে নামমাত্র উচ্ছেদে থামছে না অবৈধ কারখানা
সাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে গ্যাস সংকট ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চুনা ও ঢালাই কারখানার দৌরাত্ম্য থামছেই না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও নেপথ্যের মূল কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় বারবার সক্রিয় হয়ে উঠছে এসব অবৈধ কারখানা। ফলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপ হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বারবার অভিযান, তবুও কেন থামছে না?
চলতি বছরের শুরু থেকে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর, ঝাউচর,সাদিপুর,জামপুর,মিরেরটেক,নানাখী,পৌনসভাসহ বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যৌথ উদ্যোগে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
অভিযানগুলোতে এক্সকাভেটর দিয়ে ডজন ডজন অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানার ভাট্টি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার অবৈধ আবাসিক চুলার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযানের আগেই কারখানার মালিকরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে বড় ধরনের জেল বা জরিমানা করা সম্ভব হয়নি। নামমাত্র কিছু আর্থিক জরিমানা ও ‘অজ্ঞাতনামা’ মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আইনি পদক্ষেপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের খবর আগে থেকেই কোনো কোনো মহলের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়, যার ফলে মূল অপরাধীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার গ্যাস চুরি
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে বিশাল আকৃতির চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর: বিভিন্ন অভিযানে প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার ঘনফুট অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারী কারখানাগুলোর সোর্স পয়েন্ট কিলিং এবং রাইজার-পাইপ জব্দ করা হয়।
গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহেও পিরোজপুর ও আশপাশের এলাকায় ৫টি চুনা ও ১টি ঢালাই কারখানার ১২টি ভাট্টি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রতিদিন অন্তত ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকার সরকারি গ্যাস চুরি বন্ধ ও সাশ্রয় হয় বলে জানায় তিতাস কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশ বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে
গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের আবাসিক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রায় ৫৬টি অবৈধ চুনা কারখানার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মানববন্ধন করেছে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, সোনারগাঁ শাখা।
বক্তারা বলেন, অপরিকল্পিত এসব কারখানার কালো ধোঁয়া ও দূষণে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি মাটি ও পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় মহলের উদ্বেগ ও কঠোর শাস্তির দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল লোক দেখানো উচ্ছেদ বা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটকে দমন করা সম্ভব নয়। রাতের আঁধারে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যারা পুনরায় এই অবৈধ সংযোগ স্থাপন করছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক জেল ও অর্থদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক সচিব খাইরুল ইসলাম সজিবসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও গ্যাসের এই অপচয় ও সংকটের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের দাবি, নামমাত্র জরিমানা ও দায়সারা পদক্ষেপের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে তিতাস গ্যাস ও প্রশাসনকে আরও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে, তবেই রক্ষা পাবে জাতীয় সম্পদ ও স্থানীয় পরিবেশ।